Tuesday, 26 June 2018

Review:: Rainbow Jelly (Bengali Movie, 2018)

রেইনবো জেলি | সৌকর্য ঘোষাল

বাংলা ভাষা আমার প্রিয় ভাষা এবং সিনেমা আমার প্রিয় শিল্পমাধ্যম। কাজেই সবসময় চোখকান খোলা রাখতে হয়, কাগজপত্রে, দেওয়ালে হোর্ডিংএ। ফেসবুক থেকে সন্ন্যাস নেওয়ায় ফেসবুকের দেওয়ালে নজর রাখতে হচ্ছে না আর। চোখকান খুলে রাখতে হয় কখন কোন আনকোরা পরিচালকের নতুন চেষ্টা নজর এড়িয়ে পালিয়ে যায়। আবার এটাও ঠিক, আমার ছানা যেমন তার খাবার নিয়ে পিকি এবং চুজি, আমি সিনেমা নিয়ে ঠিক তেমনি। তো এই কারণে খুব কম সিনেমা হল এ গিয়ে দেখি। অধিকাংশই নেটফ্লিক্সের জিম্মাদারিতে থাকি। তো গতকাল, না ঠিক করে বললে কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে রেইনবো জেলি নাম টা প্রথম দেখলাম। এবার সত্যি বলতে বাংলা ভাষায় একটা সিনেমায় বাচ্চার মুখ পোষ্টারে দেখলেই সরাসরি সিনেমা দেখতে যেতে ইচ্ছে করে। তবু, অনেক পচা পচা অভিজ্ঞতা আছে। ওপেন টি বায়োস্কোপ এর পরে অনিন্দ্যের সিনেমা দেখা অবশ্যকর্তব্য ভেবে গেছিলাম প্রজাপতি বিস্কুট দেখতে। অভদ্র গালাগাল দিতে বাধ্য করেছিলো সেবার অনিন্দ্য। এরকম অনেক অভিজ্ঞতা আছে। সাহেব বিবি গোলাম এর পরে মাছের ঝোল। ইত্যাদি প্রভৃতি। তো প্রসঙ্গে ফিরি। মন তো আনচান করে, কিন্তু ঠিক করে উঠতে পারি না কি করবো। পার্টনার কে ধরি, যদি সে কোন সাহায্যে আসে। দুজনে মিলে গুছিয়ে ট্রেইলার দেখা হয় বেশ কয়েকবার।সৃজিত মুখুজ্জের উমার ট্রেইলার দেখার পরে মনস্থির করতে সুবিধে হলো। 

হাইল্যাণ্ড পার্ক, বিকেল পাঁচটা। টিকেট কাউন্টার বলে নাকি প্রায় ফুল!!?? অ্যাঁ?? কোল্কেতান দের হলোটা কি? উমা না দেখে রেইনবো জেলি? কোথায় ঝকঝকে কাস্ট অ্যান্ড ক্রু, লোকেশন, মেলোডিয়াস সাউণ্ড, এইসব ছেড়ে লোকে একটা অ্যাবনর্ম্যাল বাচ্চা কে দেখতে আসছে?? হাল্কা বদহজম হলো।

আর ওই যে বলছিলাম, কাগজপত্রে নজর রাখতে হয়। তো সেই করতে করতে রোববার এর ক্রোড়পত্রে পরিচালকের জবানিতে যে গল্প শুনলাম, তাতে আমার কেন জানি না পথের পাঁচালী তৈরির রূপকথাসম গল্পটা মনে পড়ে গেল। আশেপাশে সবাইকে এত অল্পে আপোষ করে নিতে দেখি,নিজেও কিছু ব্যতিক্রম নই, সেখানে সৌকর্যের এই অনাপোষী স্ট্যান্ড পয়েন্টে ব্যোমকে গিয়ে, সিনেমা শুরুর আগেই অর্ধেক হৃদয়দান করে রেখেছিলাম।

সিনেমার শুরুতেই আবার বাংলা ভাষা প্রেমের জন্য ৫ পয়েন্ট পেয়ে গেল রেইনবো জেলি। 'অ্যানিমিটিয়েছে' !! আহা!! চুমু!! পুরো টাইটেল কার্ডের বাংলা করেছেন, আদর যত্ন করে। বড্ড ভালো লাগলো। 

তারপর সিনেমা। গল্প যেটুকু না দিলে হয়না, সেটুকু ট্রেইলারে আছে। তাছাড়া এ গল্পের স্পয়লার কি হয় আর? গল্প তো সবার মোটামুটি জানা। সেই পুরানো মেরি পপিন্সের গল্প। মনখারাপি বাচ্চাকে এসে বাঁচায় এক ফেয়ারি। গল্প তো একলাইনে বলে দিতেই পারি। তাতে এই সিনেমার রিভিউ কাঁচকলা হয়। আসল গল্প তো বল্লো তিনজন। ঘোঁতন, গণ্ডারিয়া, আর পরীপিসি।যে গল্পের স্ক্রিপ্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়। 

বৃহত্তর জনগণের মহত্তর স্বার্থে অল্প কথায় একবার আউড়ে দি গল্পটা। বাবা মা হারা বাচ্চা ঘোঁতন, মামার সাথে তার বিশাল পৈতৃক বাড়িতে থাকে। মামা কাবুলিওয়ালার কাছে ধার নিয়ে সংসার চালায়। ঘোঁতন, মামার লাথি, গালাগাল খেয়ে বেঁচে থাকে। মামা রাতে ওল্ড মনকের বোতল খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে, সকালে চা এনে হাতে দেয় ঘোঁতন। এরোপ্লেন, ছবি আঁকা, মায়ের ছবির সাথে কথাবলা ছাড়া ঘোঁতনের জীবনের সবচেয়ে রঙচঙে জিনিস হলো পপিন্স। না, লজেন্স না। একটা পুঁচকি, মাথা ভরা কোঁকড়া চুল যার। জন্মদিনে চায়ের দোকানের অনাদিদার থেকে মোমরঙ পায় ঘোঁতন। আর পপিন্স দেয় খাতা। প্রথম পাতায় ঘোঁতনের ছবি, নিচে লিটল প্রিন্স লেখা। জন্মদিনে মামা দেয় মার, খাবার পচে যাবার অপরাধে। সেই রাতেই আসে পরীপিসি। গল্পের বদল ঘটে দ্রুত। আমরা জানতে পারি, ঘোঁতনের বাবার বানানো এক রোবটের পেটে রাখা আছে যখের ধন, যা কিনা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। যখের ধন একলা খাবে বলে বসে আছে মামা। আমার এই ম্যাড়মেড়ে গল্প বলার ধরণ বেকার সহ্য কেন করবেন বলুন তো, অ্যাঁ? বরং হলে চলে যান, ছানাপোনাদের নিয়েই যান।

ও, আরেকটা কথা বলে নি, ঘোঁতন কিন্তু স্পেশ্যাল চাইল্ড, ফরেস্ট গাম্পের মতন, মার্জিনাল আই.কিউ। মহাব্রত, যে ঘোঁতন কে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে, সেও স্পেশ্যাল চাইল্ড।

কয়েকটা জিনিস চোখে লেগেছে, সেটা চটপট সেরে নি? এক, স্ক্রিপ্টে বেশ কিছু ডায়ালগ একটু বেশি রিপিটিটিভ লেগেছে। অপয়ার ছেলে কথাটা মাঝে মাঝে চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়েছে। আর স্পেশ্যাল ডিশ গুলোর কয়েকটার পরিমাণ একটু বিসদৃশ লেগেছে। কোলড্রণে পরী রান্না করছে, এই দৃশ্যটা বেশ লাগছিল, খালি, অতটা রান্না কি হবে, এই চিন্তাটা চলে আসছিল, কারণ বোধহয় সিনেমার ঘরোয়া পরিবেশ। আর পপিন্সের বাবাকে অকারণে একটু বেশি হৃদয়হীন লেগেছে। একটু অযথা পিতৃতান্ত্রিক লেগেছে।হয়তো অনিচ্ছাকৃত,কিন্তু লেগেছে।

অল্প কথায় যা যা বলা যায়, বলে ফেলেছি। এবার যা বলার, তা অল্প কথায় তো বলা সম্ভব না। অটিস্টিক বাচ্চাদের নিয়ে সিনেমা অনেক হয়েছে, কিন্তু আমার সীমিত জ্ঞানে আমার জানা নেই, কোন অটিস্টিক বাচ্চাকে ব্যবহার করা হয়েছে সেই চরিত্রের রূপায়ণে। কদিন আগেই আবার ফরেস্ট গাম্প দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম টম হ্যাংক্স এর মতন সুদর্শন পুরুষ না থাকলে কি দর্শক ফরেস্টের প্রতি এত সদয় হতেন? লিওনার্দো ডে ক্যাপ্রিওর সৌন্দর্য না বেচে কি আর্নি জনপ্রিয় হত? জানি না। কারণ কেউ সেই রিস্ক নেন নি। আর সৌকর্য নিয়েছেন। মহাব্রতকে ব্যালান্স করিয়ে চায়ের কাপ হাতে হাঁটিয়েছেন। নিজে প্রোডিউসার,  রিলিজ, মার্কেটিং সব ব্যালান্স করেছেন। আপোষহীন ভাবে।

তারপর গল্প। অনেক সাবপ্লটস। বিশেষত কোলকাতার হ্যারি পটার এর মা বাবা হীনতার পাশাপাশি, পপিন্সের বাবামা কে মিস করা দেখিয়ে সৌকর্য একটা ভীষণ জরুরী কথা বলেছেন। একাকীত্ব ভীষণ জরুরী বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার জন্য। কিম্বা ঘোঁতন যেভাবে সবকিছু পিক্টোরিয়াল ভাবে দেখে। পপিন্স যেভাবে সহজে ঘোঁতনের সাথে মেশে যা আমার আশেপাশের দেখা ছবি থেকে ভীষণ আলাদা। অবশ্য রূপকথায় তো কত অবাস্তব ই দেখায়। মামার চরিত্রটিকেও পুরোপুরি ভিলেন ভাবা যায় না কারণ সেও কখনো সাম্য দেখেনি, কারণ তার উচ্চারণে সামান্য জড়তা তাকে তার আশপাশের লোকেদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে সবসময়। কাবুলিওয়ালার প্রতিও সৌকর্য সহৃদয়। এ এমন রূপকথা যেখানে কোন ভোল্ডেমর্ট নেই। সবাই যার যার নিজের চরিত্রে সাদাকালো মিশিয়ে আছে। 

আমি কি নিয়ে হল থেকে বেরোলাম সেটাও জানাই। আকাশে উড়ে যাওয়া প্লেন হাঁ করে দেখি সেই কবে থেকে, কিন্তু তার সাথে যে ইচ্ছেপূরণের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তা আগে জানলে অন্তত আমাজনের জঙ্গলে ঘুরে আসা হয়ে যেত আমার। বেটার লেট দ্যান নেভার। এখন খেয়াল রাখছি। আর ঘোঁতনের মতন সবসময় ভালো।ভালো কথা ভাবছি।

আর ভাবছি, এরপরে যেসব ডাক্তাররা, এবং হতে চলা বাবা মায়েরা গর্ভাবস্থায় বাচ্চা অটিস্টিক কি না জেনে বাচ্চাকে মেরে ফেলবেন তাদের কি বলবো? সূর্য্যের সাত রঙ, সাত রঙ, সাত রঙ, এই মন্ত্রে কি তাঁরা বুঝতে শিখবেন যে প্রতিটা মানুষ আলাদা। তাদেরকে এক ছাঁচে না ফেলাটাই চালাকি। পরেরবার এরোপ্লেন উড়ে যাবার আওয়াজ পেলে আমি খুব জোরসে, মন থেকে এইটাই চাইবো। 

 বিদিশা পাল

No comments:

Post a Comment

Review:: Rainbow Jelly (Bengali Movie, 2018)

রেইনবো জেলি | সৌকর্য ঘোষাল বাংলা ভাষা আমার প্রিয় ভাষা এবং সিনেমা আমার প্রিয় শিল্পমাধ্যম। কাজেই সবসময় চোখকান খোলা রাখতে হয়, কাগজপত্রে, ...